ঢাকা : সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম :

  • দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক : মমতা           কারও মুখের দিকে তাকিয়ে মনোনয়ন দেয়া হবে না : প্রধানমন্ত্রী          ২২তম অধিবেশন চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত          জীবনমান উন্নয়নের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী          দেশের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে          বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছতে পারবে না : জয়
printer
প্রকাশ : ১৩ মে, ২০১৮ ১৮:৫১:০৫আপডেট : ১৬ মে, ২০১৮ ১৫:৪৬:৩০
মে দিবসের আগে-পরের কথকতা, কত কথা
করীম রেজা


 


মহান মে দিবস কিংবা মে দিবস অমর হোক, এই দুটি সেøাগান অত্যন্ত জনপ্রিয় বাংলাদেশ তথা পৃথিবীতে। ১৩২ বছর আগের এই দিন শ্রমিকশ্রেণী বিরাট আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নিয়েছিল। সেই দিনটি স্মরণ করেই  চর্চিত, চর্বিত স্লোগান মে দিবস অমর হোক।

 

অমর হয়েছে কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আজ পর্যন্ত আদায় হয়নি। বলা যেতে পারে- কালে কালে, যুগে যুগে এই আন্দোলন চলছে। এই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে এবং কিছু কিছু অধিকার আদায় হবে। কিন্তু অন্যান্য অধিকার ন্যায্য হলেও তা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে।

 

১৩২ বছর আগে শ্রমজীবী মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিল, আজো মানুষকে সেভাবেই অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও অধিক কঠিন সংগ্রাম করতে হয় আজকের দিনে।

 

প্রাথমিকভাবে যারা কলে-কারখানায়, মিল-ফ্যাক্টরিতে, অধুনা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করেন তাদেরই শ্রমিক বলে নির্দেশ করা হয়। কিন্তু যারা অফিস-আদালতে চাকরি করছেন, স্কুল-কলেজে কাজ করছেন, কৃষি ক্ষেত্রে আছেন তারাও শ্রমিক। কারণ তারা সবাই শ্রমঘণ্টা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে কৃষি শ্রমিকদের পরিশ্রম, ত্যাগ ও অবহেলিত অবস্থার কথা তেমনভাবে আলোচনা করা হয় না ।

 

তাছাড়া  একটি শ্রেণীর  মানুষদের শ্রমিকের সাধারণ সংজ্ঞায় বিবেচনা করা হয় না। যাদের শ্রমিক বলা আমাদের সমাজে প্রচলিত নয় যদিও তারা সর্বাংশেই শ্রমিক। সরকারি কর্মচারী, করপোরেশন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারা নিজেদের অনেক উঁচু পদের  শ্রমিক মনে করেন। বলা যেতে পারে, তারা বাবু বা সাহেব শ্রমিক, কারণ তারা পোশাকে-আশাকে কেতাদুরস্ত থাকেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে কাজ করেন।

 

সাধারণ শ্রমিক যাদের বলা হয় তাদের সুবিধা-অসুবিধা ভালো-মন্দ বিষয়ে নানা রকম নীতি-নির্ধারণ, রচনা, প্রয়োগ ব্যবস্থাপনা তারাই করেন। কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না তাদের  দিয়ে।

 

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুর বদল ঘটলেও আপেক্ষিকভাবে শ্রমিকের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুঁজির কাছে শ্রম স্বার্থ এবং শ্রমিকস্বার্থ অসহায়। আগেও ছিল, এখনো রয়েছে এবং থাকবেও।

 

এই খেটেখাওয়া মানুষরা মালিকের সঙ্গে যেমন তেমনি বাবুশ্রমিকদের সঙ্গে যখন তখন দেখা করতে পারেন না। সাধারণভাবে শ্রমিক যাদের বলা হয় তারা এবং অফিস-আদালতের যারা শ্রমজীবী বাবু, দুই শ্রেণীর মধ্যে দুস্তর ব্যবধান, আকাশ-পাতাল ফারাক। সাহেব শ্রমিকদের অবদানের তুলনায় সাধারণ শ্রমিকদের অবদান অনেক বেশি সেকথাও তুলনামূলক আলোচনায় উঠে আসে না। শ্রমিক সমাজের ভোগান্তির কালে তারা স্পষ্টভাবেই নিজেদের আলাদা করে রাখেন। তারা মালিকপক্ষের স্বার্থই বড় করে দেখেন। ব্রাত্য শ্রমিকের সঙ্গে সুনির্দিষ্টরূপে নিজের পার্থক্য রচনা করেন। এদের কর্মপরিবেশের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকের কর্মপরিবেশের বিরাট পার্থক্য রয়েছে, অন্যদিকে কৃষিক্ষেত্রে যারা কাজ করেন তাদের কর্ম পরিবেশের সঙ্গে অন্য কারো কাজের পরিবেশ বা অবস্থার তুলনা করা যায় না।
আমরা যদি রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশন ঘটনার কথা স্মরণ করি তাহলে দেখা যায় গার্মেন্টস শিল্পে কাজের পরিবেশের অনেক পরিবর্তন এবং উন্নতি হয়েছে। দুর্ঘটনার পরে আমদানিকারক দেশের চাপে বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানার পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, রানা প্লাজা এবং অন্যান্য কারখানায় দুর্ঘটনা না ঘটলে এবং বিদেশি ক্রেতারা চাপ না দিলে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটত না। স্থানীয়ভাবে নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশে কাজের সুযোগ তৈরিতে মালিকপক্ষের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কাগজপত্র থাকলেও বাস্তবে নেই।  

 

এরপর রয়েছে বেতন বৈষম্য। যারা অফিস-আদালতে কাজ করেন তাদের সঙ্গে উৎপাদনের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত সেই শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য বিরাট। বৈষম্য নিরসনের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলো মালিকপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে চেষ্টা করে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির। মনে রাখতে হবে, নিবেদিত ত্যাগী নেতার অভাবে শ্রমিকের স্বার্থ কখনোই শতভাগ নিশ্চিত করা যায়নি কোনো আন্দোলন কিংবা দুপক্ষের আলোচনায়।

 

উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নয় অর্থাৎ যারা দাফতরিক কাজ করেন তাদের সঙ্গে সরাসরি উৎপাদনে জড়িত শ্রমিকদের সঙ্গে বেতন বৈষম্য ছাড়াও রয়েছে সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিরাট ব্যবধান। নানা রকম অতিরিক্ত সুবিধা, গাড়ি-বাড়ি কিংবা প্রভিডেন্ট ফান্ড এসবের কোনো সুবিধাই সাধারণ শ্রমিকের ক্ষেত্রে নেই।
শ্রমিকরা যা বেতন পায় তা দিয়ে এই দুর্মূল্যের বাজারে পরিবারের ভরণ-পোষণের পর সঞ্চয় কিছুই থাকে না। কোনো কারণে যদি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় অথবা শ্রমিককে বরখাস্ত করা হয় তখন তাকে শূন্য হাতে ঘরে ফিরতে হয়। আয়ের একমাত্র উপায় চাকরি হারাতে হয়।

 

যারা অফিসে চাকরি করে তাদের যেমন পেনশন সুবিধা থাকে শ্রমিকদের বেলায় তা থাকে না। সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা এবং পরিকল্পনা করছে সরকার। এইসঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের বিষয়টিও বিবেচনার দরকার।

 

দলীয়ভাবে বীমা ব্যবস্থা অধিকাংশ কোম্পানিতেই নেই। সরকারি বা বেসরকারি কর্মচারীর জন্য নানারকম সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য তা দুর্লভ বস্তু যদিও অফিস-আদালতে যারা কাজ করেন তাদের বেতন শ্রমিকদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

 

কৃষি, পরিবহন, মিল কারখানা, দৈনন্দিন প্রয়োজনে কর্মজীবী মানুষ, শিশু শ্রমিক, নারী শ্রমিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের দেশে রয়েছে বৈষম্য। এই বৈষম্য কাটিয়ে ওঠা না গেলে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের মানব সমাজের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আন্দোলনের ধারণা, সংগ্রামের চেতনা চিরদিন অপরিবর্তিত থাকবে। পাশাপাশি অপরিবর্তিত থাকবে সাধারণ শ্রমিক বলে যাদের আমরা চিনি জানি তাদের সার্বিক অবস্থা। তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামও অব্যাহত থাকবে অনির্দিষ্টকাল।

 

পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংবাদ ছাপা হয়। মে দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মজদুরের হাতিয়ার কিংবা শ্রমিকের হাত সুদৃশ্য রকমভাবে অঙ্কন করে মে দিবসের মাহাত্ম্য প্রচার করে, এমন ধারা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। আমরা একবারও ভেবে দেখি না এতে করে আর যাই হোক শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না। শ্রমিকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। বেতন-বৈষম্যের কোনো সুরাহা হয় না। নারী ও শিশু শ্রমিকের শোষণ বন্ধ হয় না। সর্বোপরি যে চেতনায় ১৩২ বছর আগে মে মাসের ১ তারিখে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল আজো তা অব্যাহত রয়েছে।

 

মানব সমাজ যতদিন থাকবে, শিল্প-কারখানা যতদিন থাকবে; সর্বস্তরে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামও অব্যাহত থাকবে।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট, ই-মেইল : karimreza9@gmail.com

printer
সর্বশেষ সংবাদ
মুক্ত কলম পাতার আরো খবর

Developed by orangebd