সারা বিশ্বের মুসমান জাতির জন্য দু’টি ঈদ মহামিলনের দিন। এই দু’টি ঈদ হলো- ১. ঈদুল ফিতর ২. ঈদুল আযহা। এই দু’টি দিনে ধনী-গরীব একই কাতারে নামাজ আদায় করেন। একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন। কিন্তু এ বছর মার্কেটগুলোতে নেই তেমন ভিড়, পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঈদের নতুন জামাকাপড়, জুতা ও প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসলেও ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না মার্কেটগুলোর বিক্রেতারা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশেহারা। এছাড়াও অস্থিতিশীল রাজনীতিতে হতাশায় দিন পার করছেন দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেচাকেনায় ভাটা ঈদ আনন্দ মলিন। এসব নিয়েই এবারের টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন; লিখেছেন এ কে নাহিদ
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উচ্চ মূল্যস্ফীতি ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রেই পেয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সে সময় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রথম অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিলেও বাংলাদেশ করেছিল উল্টোটা। সুদের হার নিয়ে নয়-ছয় অব্যাহত ছিল, জ্বালানি তেলের দর একবারেই বাড়ানো হয়েছিল ৫১ শতাংশ, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া অব্যাহত রাখে, বাজারেও ছিল না কার্যকর কোনো নজরদারি, বিপর্যস্ত হয় সরবরাহব্যবস্থা, ছিল প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য। বলা যায়, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের একের পর এক ভুল নীতির ফলই হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ আগস্ট যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এরপর পাঁচ মাসের বেশি সময় চলে গেছে। সেই মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে হয়েছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর মধ্যে আবার সরকার শতাধিক পণ্যের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। এতেও জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বাড়বে বলেই আশঙ্কা। চালের দাম ও ভ্যাটের এই যৌথ প্রভাবের কারণে সামাজিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে, ‘ভ্যাটে-ভাতে বাঙালি’। সুতরাং আপাতত উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে রেহাই নেই বলে মনে হচ্ছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে দেশের মানুষের লড়াই শুরু হয় এবং তখন থেকে মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের ওপর ঘোরাফেরা করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশে। ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের ব্যয়ের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে প্ররোচিত করছে। বিশেষ করে কন্ডিশনার, ডিটারজেন্ট, শ্যাম্পু, বাইরের খাবারসহ বিভিন্ন প্রসাধনীর মতো অপ্রয়োজনয়ি পণ্য ব্যবহারে।দেশের ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস (এফএমসিজি) কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের বিক্রি প্রায় পাঁচ শতাংশ কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এতে এফএমসিজি বাজারে প্রভাব পড়েছে। যেসব ক্রেতা ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার অব্যাহত রাখতে চাচ্ছেন, তারা মিনি-প্যাক কিনছেন। আবার অনেকে ভালো মানের ডিটারজেন্ট বাদ দিয়ে সস্তা ডিটারজেন্ট কিনছেন। যার প্রভাব পড়েছে পুরো এফএমসিজি খাতে।’ ভোক্তারা খরচ কমাতে প্রথমে এফএমসিজি, জামাকাপড় ও জুতোর পেছনে খরচ কমাতে শুরু করে। তারা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে চান না। কারণ তারা জানে, খাদ্য সংকটের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। এজন্য তারা প্রথমেই এফএমসিজির খরচ কমিয়েছেন। ২০২২ সাল
থেকে এই প্রবণতা শুরু হয়। ২০২৩ সালেও অব্যাহত ছিল এবং ২০২৪ সালে আরও তীব্র হয়। এরই মধ্যে শুরু রমজান মাস। দেশের রাজধানীর মার্কেটগুলোতে নেই তেমন ভিড়, পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঈদের নতুন জামাকাপড়, জুতা ও প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসলেও ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না মার্কেটগুলোর বিক্রেতারা। হতাশায় দিন পার করছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী। নগরীতে ছোট-বড় অসংখ্য বহুতল মার্কেট ও বিপণিবিতান রয়েছে। কিন্তু বেচাকেনায় ভাটা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে চললে প্রচুর টাকা লোকসান গুনতে হবে, ঈদ সামনে রেখে নিত্যনতুন পণ্যসামগ্রী দোকানে তুললেও ক্রেতা না থাকায় হতাশায় ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এর মূল কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মানুষ নিত্যদিন পরিবারের খাবারের জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে পরিবারের খাবারের জোগান দিতে। এর মধ্যে কমেছে মানুষের আয় রোজগার, এক দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে রোজগার কমে আসায় ঈদ আনন্দের আশা ছেড়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্যের জোগান দিতেই প্রতিটি পরিবার মাসের আয়ের পুরোটাই খরচ করছে। চাল, ডাল, তেল, নুন, মাছ, মাংস, সবজি, মসলাসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। মানুষ ইফতার ও সাহরিতে একটু ভালো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে চায়, সেখানেও বাদ সেধেছে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনো রকমে ইফতার ও সাহরি সারছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের টেকা দায় হয়ে পড়েছে। জীবনধারণের উপযোগী প্রতিটি জিনিসের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তাই এবার ঈদের কেনাকাটায় পোশাকের পেছনে ব্যয় কম করছে মানুষ। কয়েক বছর করোনা মহামারীসহ নানা কারণে ব্যবসা ভালো হয়নি। বিক্রেতারা বলছেন, এবারও ঈদের বাজার খুব বেশি ভালো না। গত বছরের তুলনায় এবার ২০-৩০ শতাংশ বিক্রি কমেছে। মানুষ এবার কেনাকাটা কম করছে। হাতে টাকা নেই। ঈদের সময় অনেকে শখের বসেও পোশাক কেনে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে একেবারে প্রয়োজন ছাড়া কেউ মার্কেটে আসছে না। এলেও অল্প টাকার মধ্যে কেনাকাটা সারছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, মানুষের বাড়তি আয় না থাকার কারণে ঈদবাজারের প্রতি বিমুখ হচ্ছে। অন্য বছরগুলোয় তুলনা এবার ক্রেতা উপস্থিতি কম। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের ঈদের আনন্দ মলিন করে দিয়েছে।
সময়েরে পরিক্রমায় ঈদ আসবে, ঈদ যাবে ছেলে বেলায় সামান্য কিছু প্রাপ্তিতে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকতাম। হয়তো আজকের শিশুরাও তেমনই হবেন; বিষয়টি যার যার অভিভাবকই ভালো উপলদ্ধি করেন। তবে দেশের অর্থনীতিকে যদি গতিশীল রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে শুধুমাত্র শিশু নয় সবার আনন্দ-উল্লাস মলিন হবে; এটি স্বাভাবিক। আর অর্থনীতি ঠিক না থকলে গণতন্ত্রও টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনীতি। আর এই সব কিছুর মূলেই সরকারকেই ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের মানুষ আনন্দ-উল্লাসে ঈদ উৎযাপন করুক; এটিই আমাদের কাম্য।