২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, এখন সময় রাত ১০:২১ মিনিট
শিরোনাম
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. কৃষি
  6. খুলনা
  7. খেলাধূলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চট্রগ্রাম
  10. জাতীয়
  11. ঢাকা
  12. তথ্য-প্রযুক্তি
  13. ধর্মতত্ত্ব
  14. প্রকৃতি-পরিবেশ
  15. প্রবাস জীবন

অর্থনীতির সংকট কাটতে এখনো অনেক রাত বাকি!

প্রতিবেদক
এ কে নাহিদ
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ ৩:১৮ অপরাহ্ণ

দেশ পরিচালনায় বিএনপি সরকার ছয় মাস অতিবাহিত করেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির গতি এখনো ফেরেনি। গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। পাশাপাশি তীব্র লোডশেডিং জনগণকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে বিপুল খেলাপি ঋণ, নিম্ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, নিম্ন রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট। এতে অর্থনৈতিক সংকট দগদগে হয়ে উঠছে। চারদিকে হাহাকার। সময়ের পরিক্রমায় রাষ্ট্রনীতির ভুল সিগ্ধান্তে এই পরিস্থিতি সৃষ্ট হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ঋণনির্ভর উন্নয়ন আর দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির মাশুল দিচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণ। বলতে গেলে, বর্তমান সরকার এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। এই অবস্থায় যে কোনো নতুন সরকারের দিশাহারা হওয়ার কথা। তবে বর্তমান সরকার শান্ত, ধীরস্থিরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হলো- সরকার যদি আন্তরিক হয় তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকার সেই পথেই হাঁটছে এবং ধীরে সুস্থে সঠিক সমাধানের পথ খুঁজছে। এতে অর্থনীতিতে কিছুটা আস্থা ফিরছে তবে এখনো সংকট কাটেনি। অর্থনীতির সংকট কাটতে এখনো অনেক রাত বাকি! এই নিয়েই এবারের টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন; লিখেছেন এ কে নাহিদ
একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ৩টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ২. স্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ৩. বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। এই তিনটি বিষয় একে অন্যের পরিপূরক। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যেমন অর্থনীতিতে গতি আসে না তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই একা টিকে থাকতে পারে না। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে জরুরি প্রয়োজনে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। আবার অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হলে বন্ধুও কমে যায়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা পররাষ্ট্রনীতি সঠিক পথে পরিচালিত করতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা জরুরি। তিনটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমেই একটি দেশ এগিয়ে যেতে পারে। দেশের অগ্রগতির এই সূত্রকে অনেকটা জ্যামিতির ত্রিভুজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ত্রিভুজের তিন বাহু সমান না হলে যেমন সমবাহু ত্রিভুজ হয় না ঠিক তেমনি অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি সমানভাবে কাজ না করলে রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। আর এই ত্রিভুজ সমান্তরাল করার দায়িত্ব হলো রাজনীতির। সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া ত্রিভুজতত্ত্ব অচল। রাজনীতি সঠিক না হলে কিছুই ঠিক হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশকে চরম খারাপ অবস্থানে নিয়ে গেছে ইউনূস সরকার। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ইউনূস সরকার যেখানে বাংলাদেশকে পেয়েছিল, দেড় বছরে তিনি এবং তার সরকার দেশকে আরো অন্তত ৩০ বছর পেছনে ঠেলে দিয়েছেন। ইউনূস সরকারের দেশ পরিচালনার নীতিই সঠিক ছিল না। এই কারণেই দেশের অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি ভুল পথে চালিত হয়। বলতে গেলে, ইউনূস সরকারের কোনো রাজনৈতিক দর্শন ছিল না। এছাড়াও কোনো জবাবদিহি ছিল না, ছিল শুধু ব্যক্তিবন্দনা। দেশ পরিচালনায় ড. ইউনূসের কোনো নীতি, কৌশল বা দর্শন ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে যত দিন পারা যায় তত দিন ক্ষমতায় টিকে থাকা। ক্ষমতায় থেকে নিজের স্বার্থ হাসিল করা। বেশির ভাগ উপদেষ্টারও লক্ষ্য ছিল তা-ই। রাজনীতি হলো- দেশ পরিচালনার ড্রাইভিং সিট। চালক যদি অদক্ষ হয় এবং ভুল পথে গাড়ি চালায় তাহলে যেমন দুর্ঘটনা ঘটে তেমনি সরকারপ্রধান যদি দেশের চেয়ে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চান, তাহলে দেশের সর্বনাশ হয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে সেটাই হয়েছে। ইউনূস সরকার যেমন বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিহিংসার মাধ্যমে অর্থনীতি ধ্বংস করেছে তেমনি পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে করেছে বন্ধুহীন। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ইউনূস সরকারের আমলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাটের অবাধ চারণভূমি হয়েছিল বাংলাদেশ। কল-কারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, মবের শিকার হয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। চাঁদাবাজি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে তাদের হয়রানি করা হয়েছে। ফলে দেশের হাজার হাজার কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নিয়ে গত ছয় মাসে বিএনপি সরকার বেশ কিছু দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করেছে। তবে অর্থনীতির সংকট কাটতে এখনো অনেক রাত বাকি!

ভঙ্গুর অর্থনীতি
ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার শুরুতে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রথম ছয় মাস পর দেশের সেই বিপর্যস্ত আর্থিক খাতের অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ছয় মাস পর বর্তমানে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের হিড়িক আর নেই। বিপরীতে ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে। বাড়ছে এলসি খোলার হার। অথচ ছয় মাস আগে আমদানির এলসি খোলার মতো যথেষ্ট ডলার ছিল না। রাজস্ব খাতের অস্থিরতা থেমেছে। এখন শক্তিশালী হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে অর্থনীতির সংকট এখনো কাটেনি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুরু থেকেই বলে আসছেন অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সেই হিসেবে গত ছয় মাসে সরকার অনেকটাই সফল হয়েছে বলে মনে করেন দেশের বিশেষজ্ঞমহল। কেননা ব্যাংক খাতের নগদ টাকার সংকট এখন অনেকটাই কেটেছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে না পারার অভিযোগ এখন তেমন পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে।

বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। একীভূত হওয়া ছয়টি ব্যাংকের সংকটও সমাধানের পথে। শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। রপ্তানি ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেকার সমস্যার সমাধান, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়ন, অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে আনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান প্রধান সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে সংকটগুলো কাটাতে হলে আরও অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের কারণে বিনিয়োগে উৎসাহ পাচ্ছেন না শিল্প মালিকরা। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো ছাড়া শিল্প খাতকে চাঙা করা সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি। তবে সেটার জন্য আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। প্রথম ছয় মাসে অনেকগুলো নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়ন করার সময়। আর এর ফলাফল পেতে আমাদেরকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা তো বলাই যায়, ভঙ্গুর অর্থনীতি-যেটা গর্তের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল আমরা সেটাকে রাতারাতি ঠিক করে ফেলতে পারি না। কিন্তু আমরা যেটা পারি সেটা হলো- খাদে পড়তে না দেওয়া এবং ছয় মাসে সেটাই হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অর্থবিভাগ মনে করে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথমত ব্যাংকিং খাতের সংকটই হলো- বড় সংকট। খেলাপি ঋণ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পুনরুদ্ধার করা না গেলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়তে পারে। এছাড়া সরকারি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে ব্যাংকনির্ভর সরকারি অর্থায়ন বেসরকারি খাতের অর্থায়নে চাপ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগ না করলে ৪ শতাংশের আশপাশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় ও ভোগক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সবশেষ রেমিট্যান্সনির্ভর বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য। রেমিট্যান্সের শক্তি বর্তমান সংকট সামলাতে সাহায্য করছে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক সক্ষমতার ভিত্তি হতে হলে রপ্তানি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটা করতে পারলে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করা খুব কঠিন হবে না বলে মনে করে অর্থবিভাগ। এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর আগের মতো প্রধানত বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে আটকে নেই। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতি অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাবলয় দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বস্তি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও উৎপাদন কাঠামোর দুর্বলতা আড়াল করতে পারছে না। আগামী দুই-তিন বছরের অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ধারিত হবে রিজার্ভ কত বাড়লো তা দিয়ে নয় বরং ব্যাংকিং খাত কতটা পরিষ্কার হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা ফিরলো, মূল্যস্ফীতি কতটা স্থায়ীভাবে কমলো এবং অর্থনীতি কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলো- তার ওপর।

এদিকে গত ছয় মাসের অর্থনীতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও অভ্যন্তরীণ সংকট কাটেনি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বেড়েছে, ডলারবাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৯.৫ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা বেড়ে ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭.৩ শতাংশ বেশি। তবে মূল্যস্ফীতিতে তেমন উন্নতি নেই। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ, জুনে তা দাঁড়িয়েছে ৯.১৬ শতাংশে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমেনি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ফেব্রুয়ারির ৬.০৩ শতাংশ থেকে মে মাসে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। ব্যাংকিং খাতেও সংকট প্রকট হয়েছে। ডিসেম্বরের ৩০.৬ শতাংশ থেকে মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে উঠেছে। রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। রপ্তানি খাতে জুনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুরো অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় ০.৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ছয় মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে স্বস্তি এলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা কাটেনি। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি
দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও কম প্রবৃদ্ধির কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বন্ধ হওয়া অনেক কারখানা বেকারত্ব বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। যদিও বেকারত্বের হার নিয়ে নতুন কোনো গবেষণা কিংবা পরিসংখ্যান নেই, তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ফলে দেশের কর্মসংস্থানে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। দেশের তৈরি পোশাক খাতে গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ। ফলে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হার দেশের আংশিক বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও কাজের মানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের তথ্য বলছে, ১৯তম আইসিএলএস অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ১৩তম আইসিএলএসে ডিসেম্বর শেষে দেশের বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। দেশের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। শহরে দারিদ্র্যের হার সাড়ে ১৬ শতাংশ হলেও গ্রামে যেটি ২০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র-২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পায়।
রাজস্ব আদায়
দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক (ট্যারিফ) নীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা রয়েছে, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অন্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের গতি ধীর এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। আদায় কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যবধান এখনো বড়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রকৃত আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। সরকার রাজস্ব খাতের সংস্কারের জন্য কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ আরও শক্তিশালী করার জন্য নীতি ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো নিয়ে কাজ হচ্ছে। এগুলো ভালো উদ্যোগ। তবে এখানেও মূল বিষয় হলো বাস্তবায়ন। এখনো উদ্যোগগুলো যৌক্তিক পরিণতিতে নেওয়া যায়নি। ফলে রাজস্ব খাতের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে আরও কাজ করতে হবে।
রপ্তানি আয়
রপ্তানি আয়ে সুখবর নেই। দীর্ঘদিন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত। বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ ও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং দেশীয় সংকটের প্রভাবে এই পতন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ৯০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমে বলেছেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি না বাড়ার পেছনে স্থানীয় ও বৈশ্বিক- দুই ধরনের কারণই রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তীব্র গ্যাস-জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা বড় বাধা। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তাও ক্রেতাদের নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করছে। তিনি আরও বলেছেন, বৈশ্বিকভাবে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ক্রেতারা সোর্সিং কৌশল পরিবর্তন করে কিছু অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। তবে রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদী তিনি। তিনি জানান, সরকার রপ্তানি বাড়াতে নীতি সহায়তা ও অন্য সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নে আরও গতি আনতে হবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেকটা কমেছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং মব সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সবকিছু মিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
বৈদেশিক নীতিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান কৌশল হলো- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আর এই নীতি দেখা যাচ্ছে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও। ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশের স্বার্থে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ গত ছয় মাসে দৃশ্যমান। বিশেষ করে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়সংগত দাবি যেমন প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে তুলে ধরা হচ্ছে তেমনি প্রতিবেশীর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কাজ করছেন তারেক রহমান সরকার।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা
একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম শর্ত হলো- দেশে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকার সংসদকে জবাবদিহির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সব বিষয়ে সংসদে আলোচনা করার সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে কার্যকর সংসদ মানেই জবাবদিহি। প্রথম ছয় মাসে জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য সরকারের আন্তরিকতা ও আগ্রহ প্রশ্নাতীত। প্রধানমন্ত্রী একটি জনবান্ধব সরকার হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন, সেভাবে এখনো সাফল্য আসেনি। এর প্রধান কারণ দু’টি। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী যে অবস্থায় দেশ পেয়েছেন সেখান থেকে রাতারাতি দেশের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এই জন্য সময় দরকার। প্রধানমন্ত্রী ও সরকার আন্তরিক। এই জন্য দেশ পুনর্গঠনে দরকার জাতীয় ঐক্য। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে দেশ বাঁচাতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু দেশের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে আমলাতন্ত্র এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা গুপ্তরা। যারা বিএনপিকে সফল হতে দিতে চায় না, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিল, তারা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে লুকিয়ে আছে। তারা এরই মধ্যে সরকারকে অসহযোগিতা করছে। সরকারের অভিপ্রায় মাঠে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। এই জন্য প্রশাসনের সকল স্তরে শুদ্ধি অভিযান জরুরি। বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে সরকারের সকল পর্যায়ে অর্কেস্ট্রার মতো একই সুর তুলতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।


প্রসঙ্গ মূল্যস্ফীতি
জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসা অবশ্যই স্বস্তির একটি প্রাথমিক সংকেত। জুনে এটি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে এক মাসের তথ্য দেখে মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এখানে মূল্যস্ফীতি কমা এবং পণ্যের দাম কমা-এই দুটির পার্থক্যও বুঝতে হবে। মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ৮ শতাংশে নামার অর্থ দাম কমেছে তা নয়। বরং দাম আগের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে বাড়ছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মূল্যস্তর ইতোমধ্যে অনেক ওপরে উঠে গেছে। তাই মানুষের আয় না বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমে বাজারে স্বস্তি আসবে না। সরকারকে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, আমদানির সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া, শুল্ক পরিবর্তনের সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য বিক্রি এবং নগদ সহায়তার পরিধি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান কমাতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট
বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইরান যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যায়। সরকার আন্তরিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অথচ কোনো কারণ ছাড়াই ইউনূস সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ করে রেখেছিল। গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকার পার্শ্ববর্তী দেশের সহায়তা চেয়েছে। এছাড়া সরকার একদিকে যেমন জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি জ্বালানি খাতের ভর্তুকির চাপ কমানো এবং বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন। এটা করতে পারলে তা হবে সরকারের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
বেসরকারি বিনিয়োগ
দেশের বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো দৃশ্যমান গতি ফেরেনি। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসা বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। উচ্চ সুদহার এর একটি কারণ হলেও মূল সমস্যা আরও বিস্তৃত। জ্বালানিসংকট, বিনিময় হারের ঝুঁকি, নীতির অনিশ্চয়তা, দুর্বল অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আইন-শৃঙ্খলা ও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখছে। সরকার বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে এবং কিছু নীতিগত সুবিধার কথা বলেছে। কিন্তু বিনিয়োগ কেবল প্রণোদনা বা ঋণের সুদ কমানোর মাধ্যমে আসে না। উদ্যোক্তারা প্রথমে দেখতে চান বিদ্যুৎ-গ্যাস পাওয়া যাবে কী-না, নীতি ধারাবাহিক থাকবে কী-না, কর ও শুল্ক সিদ্ধান্ত পূর্বানুমানযোগ্য কী-না এবং কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে কী-না। তাই বিনিয়োগে এখন পর্যন্ত সাফল্য সীমিত। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্ম-পরিকল্পনা, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্য রোডম্যাপ প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাত
সরকারের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা স্বীকার করা এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সমাধানের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক। তবে সংস্কারের সাফল্য সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়া একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ব্যাংকগুলোর দায় শেষ পর্যন্ত আমানতকারী বা করদাতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যারা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছেন, অর্থ পাচার করেছেন বা ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা সম্পন্ন করা, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হিসাব প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমানতকারীর আস্থা রক্ষা করার মাধ্যমে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হবে। সরকার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সেটি বজায় থাকলেই কেবল ফলাফল অর্জনের পর্যায়ে পৌঁছা যাবে।
স্থিতিশীল রাজনীতি
নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত পূরণ করেছে। অবশ্য গত ছয় মাসে কিছুটা স্বাভাবিকতা এলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণ আস্থা তৈরি হয়নি। কারণ বিনিয়োগকারীরা দেখেন দেশে আইনের প্রয়োগ কতটা নিরপেক্ষ, নীতি হঠাৎ করে বদলে যায় কী-না, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক চাপ বা চাঁদাবাজির মুখে পড়ে কী-না এবং বিরোধী মত ও সামাজিক অসন্তোষ শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে কী-না। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে- নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি, আইনের সমান প্রয়োগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা। সরকারকে দলীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। বিরোধী কণ্ঠ দমন নয় বরং অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন।
দরিদ্র জনগোষ্ঠী সুরক্ষা
অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আর এই কারণেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় গরিব জনগোষ্ঠী কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছে।
সরকারের ছয় মাসে অর্থনীতির গতিধারা
সরকারের ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির গতিধারায় বেশ কিছু সফলতার চিত্র লক্ষ্যণীয়; ১. একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক বৈধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২. বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ৩. ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নির্বাচনী কর্মসূচির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ৪. কৃষকদের ক্ষুদ্রঋণ মওকুফ এবং প্রত্যক্ষ সহায়তার উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। ৫. নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক করপ্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এগুলোকে এখনই স্থায়ী অর্থনৈতিক সাফল্য বলা যাবে না। কারণ মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ, রাজস্ব আদায় দুর্বল, বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে, কর্মসংস্থান বাড়ছে না এবং জ্বালানি সংকট শিল্পোৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাফল্যের মূল্যায়ন শুধু কতগুলো কর্মসূচি ঘোষণা বা কতগুলো কার্ড বিতরণ করা হয়েছে- তার ভিত্তিতে করা ঠিক হবে না। দেখতে হবে, মানুষের আয়, কাজের সুযোগ, উৎপাদন এবং জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন এসেছে কী-না।
অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় করণীয়
অর্থনীতির সমস্যা সমাধানে সরকারকে প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে হবে। এর জন্য খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ, বাজার প্রতিযোগিতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং আয় বৃদ্ধির সমন্বিত ব্যবস্থা দরকার। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখা। শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি কর্ম-পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক, রাজস্ব ও বিনিয়োগ পরিবেশে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার। ব্যাংক খাতের গভীর সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগসহ উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন সহজ করতে হবে। সরকারের সামনে প্রধান কাজ হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদনের বাধা দূর করা এবং মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। আগামী ছয় মাসে অগ্রাধিকারযোগ্য এইসব বিষয়ে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য ফল দেখাতে পারলে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরতে শুরু করবে। তবে অর্থনীতির সংকট কাটতে এখনো অনেক রাত বাকি! অন্ধকার রাত কেটে উন্নত সমৃদ্ধ হোক দেশের অর্থনীতি; এটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক