মানবকল্যাণভিত্তিক সেবামূলক কর্মকাণ্ড, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে হযরত সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্ট ১১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় গত ১৩ বছরের নিরীক্ষিত কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেছে। ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক কল্যাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে মোট ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে| চলতি অর্থবছরেই বিভিন্ন ব্যক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। সাম্প্রতিক অতি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিকে মানবিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকার জরুরি প্রাথমিক ত্রাণ তহবিল ঘোষণাও করা হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১-এর জমজম কনভেনশন হলে ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত ট্রাস্টের ১১তম বার্ষিক সাধারণ সভা ও মাইজভাণ্ডারী খলিফা সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত খলিফা, ট্রাস্টি, প্রতিনিধি, আলেম, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, ভক্ত-আশেকান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন, হযরত সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যান আওলাদে রাসুল (দ.) হযরত শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল-হোসাইনী আল-মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)।
বার্ষিক প্রতিবেদনে ট্রাস্টের মহাসচিব অ্যাডভোকেট কাজী মহসিন চৌধুরী জানান, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ট্রাস্ট প্রতি বছর স্বাধীন নিরীক্ষার (ইন্ডিপেনডেন্ট অডিট) মাধ্যমে আর্থিক হিসাব প্রস্তুত করে সাধারণ সভায় সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করে আসছে। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন ট্রাস্ট পরিচালনার মৌলিক নীতি হিসেবে অনুসৃত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যক্তিগত সহায়তা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় ৬০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আর গত ১৩ বছরে ট্রাস্টের মোট মানবকল্যাণমূলক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসহায়, দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে হযরত শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল-হোসাইনী আল-মাইজভাণ্ডারী বলেন, মাইজভাণ্ডারী তরিকার শিক্ষা কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবপ্রেম, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, সহনশীলতা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর আদর্শভিত্তিক মানবকল্যাণের এক সমন্বিত দর্শন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী মূল্যবোধের সংকট, সামাজিক বিভাজন ও মানবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধ্যাত্মিক চেতনা, নৈতিক শিক্ষা এবং সংগঠিত মানবসেবামূলক কার্যক্রমের বিকল্প নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যুব উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তামূলক উদ্যোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকার জরুরি ত্রাণ তহবিল ঘোষণা করেন।তিনি জানান, ট্রাস্টের চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসেবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্যোগকালে সংগঠিত মানবসেবামূলক উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে এবং আর্তমানবতার সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে হযরত সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের পাশে এগিয়ে আসা সময়ের দাবি। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক চেতনা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সমন্বয়েই একটি মানবিক ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যুব উন্নয়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, মানবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দেশ-বিদেশে মাইজভাণ্ডারী আদর্শের প্রচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ মেহবুব-এ-মইনুদ্দীন। আলোচনায় অংশ নেন আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও ট্রাস্টের সদস্য খলিফা মোহাম্মদ আলমগীর খান, প্রফেসর শহীদ মঞ্জুর, শাহসুফি হযরত জহুরুল মোবারকী, মাওলানা মুফতি বাকি বিল্লাহ আল-আজহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূইয়া চাঁদপুরী, খলিফা কবির চৌধুরীসহ বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও সংগঠকবৃন্দ। সম্মেলনের সমাপ্তিতে দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহ এবং সমগ্র মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন হযরত শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল-হোসাইনী আল-মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাওলানা মুফতি এইচ. এম. মাকসুদুর রহমান এবং দিদার হোসেন রিমন।


















