দেশের নৌপথ সারা বছর সচল রাখতে নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সরকার। একই সঙ্গে খুলনা, বরিশাল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৌপথ নিয়ে আরো তিনটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নৌপথের নিরাপত্তা, নদীবন্দর আধুনিকায়ন, আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং নতুন নৌযান চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও সারা বছর নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে নৌপথের নাব্যতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শুধু ড্রেজিং নয়, আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, নদীবন্দর ও ল্যান্ডিং স্টেশনের উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বর্ষা মৌসুমে নাব্য নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে তা প্রায় ছয় হাজার ৮০০ কিলোমিটার। সারা বছর নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো হলো এক হাজার ২৯০ কোটি টাকার মোংলা বন্দর থেকে চাঁদপুর হয়ে গোয়ালন্দ ও রূপগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথ উন্নয়ন প্রকল্প; চার হাজার ৩৭১ কোটি টাকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং চার হাজার ১৬৮ কোটি টাকার ঝিনাই, ঘাঘট, বংশী ও নাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, নৌপথের উন্নয়ন ও বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
আরো তিনটি প্রকল্পের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে সরকার। এগুলো হলো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি, নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন, জলাভূমির পরিবেশ সংরক্ষণ, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধা সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প; চট্টগ্রাম-হাতিয়া-চেয়ারম্যানঘাট থেকে ভাসানচরের সঙ্গে নৌযোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প এবং কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন আপার মেঘনা নদীর রায়পাড়া থেকে ভাটেরচর পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্প।
খুলনা বিভাগে এম-জি খালগুলোর সহায়তায় নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা হ্রাস, জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। বরিশাল বিভাগের নদীগুলোর নাব্যতা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধার জন্য ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও চলছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে নৌচলাচল ও ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
নৌযান চলাচলের নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ রিজিওনাল ওয়াটারওয়ে ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প-১-এর আওতায় রিমোট মনিটরিং সিস্টেমসমৃদ্ধ নেভিগেশন সহায়ক ব্যবস্থা শীতলক্ষ্যা নদীর ঘোড়াশাল-ময়মনসিংহ নৌপথ, মেঘনা নদীর নবীনগর লিংক চ্যানেল-৫ এবং আশুগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ নৌপথসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটে স্থাপন করা হয়েছে। এতে বয়া ও বিকনের কার্যক্রম দূর থেকে পর্যবেক্ষণ এবং ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর আধুনিকায়ন ও নৌপথে নতুন লঞ্চ সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-চাঁদপুর, ঢাকা-পটুয়াখালী, ঢাকা-ভোলা, ঢাকা-ইলিশা, ঢাকা-হাতিয়া, ঢাকা-বেতুয়াসহ বিভিন্ন রুটে নতুন লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি রুটে দিবাভাগেও নতুন যাত্রীবাহী লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছে। নৌযানের মাস্টার, চালক, সুকানিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ছয়টি ভেসেল স্টর্ম শেল্টার নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখতে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ধরে রাখার কাজও চলছে। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত প্রায় ৬১ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে। এতে ওই এলাকায় নদীর গভীরতা আট মিটারে উন্নীত হয়েছে। পলি জমে নাব্যতা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের চক্রাকার নৌপথে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে আবার ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্যসচিব আমিনুর রসুল কালের কণ্ঠকে বলেন, চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নৌপথের নাব্যতা বাড়ার পাশাপাশি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতার তারতম্য কমবে। তবে শুধু ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখা যাবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, দখল-দূষণ রোধ ও পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই নৌপথ উন্নয়ন করতে হবে।


















