কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না খাতুন বলেন, বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে। আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলত, “মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করব।” আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।
সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় আগুন লাগার পর মাকে শেষ ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন নওগাঁর আত্রাইয়ের মোহন প্রামাণিক। কণ্ঠে আতঙ্ক নিয়ে বলেছিলেন, ‘মা, দুইটা কথা কমু, আমি আর কথা কমু না। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’
এরপর আর কথা হয়নি মোহনের সঙ্গে। অগ্নিকাণ্ডে মোহনের বড় ভাই সুমন প্রামাণিকও নিহত হয়েছেন। দুই ছেলেকে হারিয়ে এখন দিশেহারা মা ময়না খাতুন।
গতকাল রোববার দুপুরে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগে। এতে ময়না খাতুনের দুই ছেলেসহ গন্ডগোহালি গ্রামের আরো দুজন নিহত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুমন ও মোহন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে তারা দেশটিতে পাড়ি দিয়েছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে। আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলত, “মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করব।” আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’
আজ সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামে ময়না খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে আছে পরিবেশ। ছেলেদের হারিয়ে শোকে কাতর পরিবারের সদস্যরা।
ময়না খাতুন জানান, অগ্নিকাণ্ডের দিন সকালে মেজো ছেলে মোহনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘কালকে মেজো ব্যাটার সঙ্গে সকালে কথা কইছি। কইল, “ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও। তুমি সুস্থ থাকো। ভাই মাল দিতে গেছে, মাল দিয়ে আসবে।”’
এরপরই তিনি কারখানায় আগুন লাগার খবর পান। আগুনের মধ্যে থেকেই মোহন তাকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
ময়না খাতুন বলেন, ‘ছাওয়াল ভয়েস ম্যাসেজ দিছে। কইছে, “মা, দুইটা কথা কমু, আমি আর কথা কমু না। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।”’
ছেলেদের হারানোর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন ময়না খাতুন। সন্তানদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দুই বাবা আমার বুকে এনে দেও বাবা। আমার বাবাদের দেখে আমি কলিজা শান্তি করব। আমার দুই ধনকে আমার বুকে এনে দে বাবা।’
মোহনের বিয়ের পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করেন তিনি। ময়না খাতুন বলেন, ‘মোহন কইতেছিল, “এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু মা।”’
কথাগুলো বলতে বলতে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সংসারের দেনা শোধ করার পাশাপাশি বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল মোহনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দেয়া তালিকা অনুযায়ী, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ নিহতের মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে।
মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।


















