দেশে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। রাজনৈতিক দল বিএনপি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এরই আলোকে নির্বাচনী হাওয়া জোরদার হয়েছে। বিএনপির প্রার্থীরা ২৩৭টি আসনে এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীও তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে রেখেছে। খুব শিগগির প্রকাশ করা হতে পারে। তালিকা প্রকাশ না করলেও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও শিগগিরই জোটগতভাবে কিংবা দলীয়ভাবে প্রার্থী তালিকা
প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্রমে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে
যেতে শুরু করেছে। বলা যায় যে, দেশে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এইসব নিয়েই এবারের
টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন; লিখেছেন এ কে নাহিদ
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কিছুদিন থেকেই নিজ নিজ এলাকায় দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের আলোচনায়ও এখন প্রাধান্য পাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। তা সত্ত্বেও নির্বাচন নিয়ে অনেকেই এখনো শঙ্কা প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও অভিযোগ উঠেছে কোনো কোনো মহল থেকে নির্বাচন বানচাল করার লক্ষ্যে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। দু’একটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে আবারও জানিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন এবং সেই নির্বাচন হবে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিতর্ক এবং মতভেদ রয়ে গেছে। তারপরেও প্রায় সবকটি দল এখন নির্বাচনমুখী। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় বাড়িয়েছেন জনসংযোগ, হচ্ছে শোভাযাত্রা, চলছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির বহর নিয়ে শোডাউন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তৎপর অনেকে। কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভিন্ন কথা বললেও তাদের স্থানীয় নেতারা পিছিয়ে নেই নির্বাচনী প্রচারে। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) জোরদার করেছে তাদের প্রস্তুতি। অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে গত ৭ নভেম্বর বলা হয়েছে, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৩৬টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গত ১০ নভেম্বর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় জরুরি বৈঠকে বসেন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। দীর্ঘ বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, এটি সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা। যেকোনো সময় বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম এটি পরিবর্তন করতে পারে। আর যেসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়নি, সেগুলো পরে ঘোষণা করা হবে। এর বাইরে কিছু আসন শরিকদের জন্য ছাড়া হবে। জানা যায়, ২৩৭টি আসনের বাইরে যে ৬৩টি আসন রয়েছে, তার মধ্যে আরও ২৩টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেওয়া হতে পারে। বাকি ৪০টি আসন পেতে পারেন জোট ও যুগপৎ আন্দোলনের নেতারা। বিএনপির প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পরপরই কিছু আসনে মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রতিবারই সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়ন নিয়ে এই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। বিশেষ করে বড় দলগুলোতে প্রতিটি আসনে অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকেন। কিন্তু একটি আসনে যেহেতু একজনকেই মনোনয়ন দিতে হয়, তাই বাকিরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারণায় ব্যস্ত। গত ৬ নভেম্বর থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী আসনে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশায় দেশবাসী তাকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দিকে। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচনী পালে লাগা হাওয়া আরও জোরে বইতে শুরু করেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছে সরকার। এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপিকে আলোচনার আহ্বান জানালেও বিএনপি কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তবে এই জটিলতা ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। ভোট উৎসবে মাততে দিন গুনছেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আয়োজনে দীর্ঘ আলোচনার পরও বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থেকেই যায়। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার আবারও রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে দ্রুত ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দিতে না পারে, তাহলে সরকার তার মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে। গত ৯ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে এই আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই আহ্বানের এখনো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে দৃশ্যমান আলোচনা করতে দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকটি দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কথা চালাচালি করছেন বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারও নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করছে। সরকার আশা করছে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই একটা সিদ্ধান্তে আসবে। এর আগে গত ৯ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বিএনপিকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। এরপর গত ৬ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন ডা. তাহের। একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনায় বসতে সময় চেয়েছে এনসিপি, এবি পার্টিসহ ৯ দল। ডা. তাহের বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করে বসার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। তিনি আগ্রহের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সঙ্গে পরামর্শ করে আমাদের জানাবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। এ বিষয়ে গত ৭ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য গত ৬ নভেম্বর (রাতে) দলের স্থায়ী কমিটির মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত খুব পরিষ্কারভাবে আপনাদের জানিয়ে দিয়েছি। ওটাই আমাদের বক্তব্য। গত ৬
নভেম্বর রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে জামায়াতের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জুলাই সনদের ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলোর আইনানুগ বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি সময়মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ করা হয়। এ ছাড়া নতুন করে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা সংকট সৃষ্টি
করে যেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাধা না আসে, সে কথাও বলেন তারা। বৈঠক-পরবর্তী সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনার পর যে বিষয়গুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারা তার অংশীদার হিসেবে সনদে উল্লিখিত সব বিষয় ধারণ করেন। সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং ওই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করাসহ ৫ দাবিতে আন্দোলনে আছে জামায়াতসহ ৮টি সমমনা রাজনৈতিক দল। গত ৬ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে দলগুলো। তাদের দাবির আলোকে গত ১১ নভেম্বর বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতসহ ৮টি সমমনা রাজনৈতিক দল। ওই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে নারাজ তাদের জন্য ২৬-এ কোনো নির্বাচন নাই। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির পাটাতন তৈরি হবে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে। আর জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। যারা জুলাইয়ের চেতনার প্রতি সম্মান রাখতে পারছে না, তারা জাতীয় নির্বাচনে মানুষের মতকে সম্মান জানাবে কীভাবে? অন্যদিকে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে দলীয় অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ৭ নভেম্বর বলেছেন, আমরা খুব পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, গণভোট হলে নির্বাচনের দিনই হতে হবে। নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই হতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষ কিছু মেনে নেবে না। গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং কয়েকটি দলের দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদের যে বিষয়গুলোতে আমাদের নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো সনদে উল্লেখ থাকার কথা ছিল; কিন্তু সেটা সেখানে রাখা হয়নি। আমরা সেটা গ্রহণ করিনি। পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম হঠাৎ করে একজন উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলনে বললেন, তাদের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সাত দিন সময় দেওয়া হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে, তারা নিজের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাহলে এতদিন ধরে যে জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার জন্য ঐকমত্য কমিশন বসল, সব সংস্কারের প্রস্তাবকে আলাপ-আলোচনা করলেন, সেটা কীভাবে হলো? এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, কোনো দলের সঙ্গে আমাদের সমস্যা নেই। আমরা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আহ্বানে দীর্ঘদিন আলোচনায় বসে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছি। এখন সবকিছুর দায়িত্ব সরকারের। তবে সরকার যদি মনে করে তারা আবারও ডাকবে, তখন আমরা বিবেচনা করবো। আলোচনায় বসতে জামায়াতের আহ্বান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়ে নতুন কোনো বক্তব্য দেব না। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গত ৭ নভেম্বর ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট বলে কিছু থাকবে না, যা ঐকমত্য হয়েছে জনগণ বাকিটা ঠিক করবে। জনগণ যদি বলে, সেগুলোই বাস্তবায়িত হবে। আমরা আশা করি, খুব দ্রুতই জুলাই সনদের আইনের ভিত্তির মাধ্যমে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব। গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব।
নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ইসি কোনো ধরনের ত্রুটি রাখতে চাইছে না বলে জানা গেছে। ভোটকেন্দ্র চূড়ান্তকরণ, নির্বাচনী সামগ্রী প্রস্তুত রাখা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত ইসি। অতীতের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে কমিশন সচেষ্ট রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণ ও নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন, যা নির্বাচনকে সব শ্রেণির মানুষের কাছে আরও অর্থবহ করে তুলবে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত ৭ নভেম্বর নেত্রকোনা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে নিশ্চিত করেছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া এরই মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং সরকার এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর। কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। ভোটের ময়দানে নামার আগে দলীয় অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছে সবাই। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এরই মধ্যে ২৩৬টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। দলটির এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে, তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছে। দলের সিনিয়র নেতাদের নাম সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় থাকায় এই নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীও অনানুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। যদিও তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ধরন ও জোটগত অবস্থান নিয়ে এখনো স্পষ্টতা কম, তবে তাদের এই উদ্যোগ দেশজুড়ে নির্বাচনী হাওয়াকে আরও গতিশীল করেছে। পাশাপাশি দলটি আরও সাতটি সমমনা দলকে নিয়ে ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন। বিএনপি এবং জামায়াতের পাশাপাশি অন্যান্য দলও নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এনসিপি তাদের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক তফশীল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। দেশজুড়ে সর্বত্রই এখন নির্বাচনের ডামাডোল। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। তারা ছোট ছোট ‘উঠান বৈঠক’ করছেন, যেখানে স্থানীয় সমস্যা শুনছেন এবং তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। গণসংযোগের মাধ্যমে তারা নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করছেন। প্রথাগত প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এখন প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে এবং দ্রুত বার্তা ছড়িয়ে দিতে অনেক প্রার্থী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
নির্বাচন বিষয়ে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর নাম ঘোষণা, ইসির প্রস্তুতি এবং সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার ফলে ভোটগ্রহণ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। জনগণ আশা করছে, আসন্ন নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ, যা জনগণের ভোটাধিকারকে সুনিশ্চিত করবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সেলিম বলেন, দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এই নির্বাচন দেশকে একটি নতুন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়। দেশের কোটি কোটি ভোটার এখন অধীর আগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা করছে, যেদিন তারা স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। অন্যদিকে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। নির্বাচনের আগে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলো বিভক্ত। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই নাজুক। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, পরিস্থিতি ততই খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকেই জোড়ালো পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।

















