timewatch
১৬ এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, রাত ৮:৫৭ মিনিট
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. কৃষি
  6. খুলনা
  7. খেলাধূলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চট্রগ্রাম
  10. জাতীয়
  11. ঢাকা
  12. তথ্য-প্রযুক্তি
  13. ধর্মতত্ত্ব
  14. প্রকৃতি-পরিবেশ
  15. প্রবাস জীবন
শিরোনাম

এক দফা বনাম এক দফা : জনগণের দফা কী?

প্রতিবেদক
রুপম আক্তার
আগস্ট ২, ২০২৩ ২:২৮ অপরাহ্ণ

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ চেয়ে ‘এক দফা এক দাবি’ ঘোষণা করেছে বিএনপি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগেরও দফা একটাই ‘শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন’। এরই আলোকে দেশের রাজনীতির প্রধান দু’টি দল এক দফায় অনড়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের দফারফা কী হবে? প্রশ্নটি অস্বাভাবিক নয়। এ নিয়েই টাইমওয়াচ বিশেষ প্রতিবেদন; লিখেছেন রুপম আক্তার

দফা একটি, সরকারের পদত্যাগ : বিএনপি

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ চেয়ে ‘এক দফা, এক দাবি’ ঘোষণা করেছে বিএনপি। ১২ জুলাই রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘোষণা দেন। এদিন বিএনপি ছাড়াও গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২-দলীয় জোট, এলডিপি, গণফোরাম, গণ অধিকার পরিষদসহ ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও জোট যুগপৎভাবে এক দফা ঘোষণা করে। ‘এক দফা, এক দাবি’ কী? এ প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী বর্তমান কর্তৃত্ববাদী অবৈধ সরকারের পদত্যাগ; এটাই এক দফা, এক দাবি। এরপর মির্জা ফখরুল এক দফা দাবিতে ১৮ ও ১৯ জুলাই দুই দিনের ‘পদযাত্রা’ কর্মসূচির ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ১৮ জুলাই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঢাকার গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত পদযাত্রা হবে। একই কর্মসূচি থাকবে জেলা ও মহানগরেও। ১৯ জুলাই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উত্তরার আবদুল্লাহপুর থেকে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত পদযাত্রা হবে। এটাকে যুগপৎ ধারার প্রাথমিক কর্মসূচি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এরপরও যদি আঙুলে ঘি না ওঠে, তাহলে কী করে ওঠাতে হয়, এ দেশের মানুষ তা জানে। বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত নেতা বক্তব্য দেন। বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আজকে আমরা একটা যৌথ ঘোষণা দেব যার যার জায়গা থেকে। প্রায় ৩৬টি রাজনৈতিক দল, জোট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সর্বসম্মতভাবে। সেই সিদ্ধান্তটি হচ্ছে…যুগপৎ ধারায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের এক দফার ঘোষণা। এক দফা, আর কোনো দফা নাই।’উল্লেখ্য, এর বাইরে এবি পার্টি সংবাদ সম্মেলন করে এক দফা দাবির প্রতি সংহতি জানায়। এক দফার ব্যাখ্যা করে মির্জা ফখরুল বলেন, এই এক দফা হচ্ছে বিদ্যমান অবৈধ সংসদের বিলুপ্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে তার অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীর মুক্তি, মিথ্যা গায়েবি মামলা প্রত্যাহার, ফরমায়েশি সাজা বাতিল, রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। ফখরুল সরকারের উদ্দেশে বলেন, পদত্যাগের এখনো সময় আছে। অন্যথায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পরিষ্কার করে বলে দেয়, তখন কিন্তু পালানোর পথও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি জানান, যুগপৎ কর্মসূচির পাশাপাশি তারুণ্যের সমাবেশ, কৃষক দল ও শ্রমিক দলের সমাবেশ, পেশাজীবীদের সমাবেশ চলবে। আওয়ামী লীগের সমাবেশের কথা উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, সারা দেশে ঘরে ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করে শান্তি সমাবেশ করে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে লগি-বইঠার দিন শেষ হয়ে গেছে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। যারা নির্বাচনে যাবে, ভোট চোরদের সমর্থন করবে, তাদের রেহাই দেওয়ার সুযোগ নেই। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশিরা তো ভারতে, নেপালে, ভুটানে, শ্রীলঙ্কায় যাচ্ছে না। বাংলাদেশে কেন আসছে, সেটা সবার কাছে পরিষ্কার। তিনি বলেন,‘ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। জনগণ জেগেছে, আপনাদের যেতে হবে।’ সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও বরকতউল্লা, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির ও হাবীব উন নবী খান, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন, ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্যসচিব আমিনুল হক। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন, সংসদ বিলুপ্তসহ ১০ দফা দাবি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা ঘোষণা করে। এরপর সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও জোটকে সঙ্গে নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ কর্মসূচি শুরু করে বিএনপি। এর ছয় মাস পর একযোগে ১২টি স্থান থেকে বিএনপিসহ ৩৭টি দল পৃথকভাবে সরকার হটানোর এক দফার ঘোষণা দিল।

শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন : আওয়ামী লীগ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে বিএনপির এক দফা দাবির বিপরীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, তাদেরও এক দফা, শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। ১২ জুলাই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে এই ঘোষণা দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘বিএনপির এক দফা হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগ। আমাদেরও এক দফা, শেখ হাসিনা ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচন শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই হবে, শেখ হাসিনাই নেতৃত্ব দেবেন।’ আওয়ামী লীগের সমাবেশের দেড় কিলোমিটার দূরে নয়াপল্টনে আরেক সমাবেশ থেকে বিএনপি সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সন্ধ্যা ছয়টার পর যখন বক্তৃতা শুরু করেন, ততক্ষণে বিএনপির সমাবেশ শেষ। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপির অনড় অবস্থানের বিপরীতে আওয়ামী লীগও সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার বিষয়ে অনড় থাকার ঘোষণা দেয়। এমনকি বিএনপির সঙ্গে আলোচনা কিংবা সংলাপের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ওবায়দুল কাদের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘খেলা হবে, নির্বাচন পর্যন্ত। মাঠ ছাড়বেন না। যখনই ডাক দেব শেখ হাসিনার নির্দেশে, তখনই আপনারা মাঠে চলে আসবেন। কোনো অপশক্তির সঙ্গে আপস করব না।’ সমাবেশের আয়োজক ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। তবে ঢাকা জেলা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ আশপাশের অনেক জেলা থেকেই বাস, পিকআপ, মিনিট্রাকে করে এসে নেতা-কর্মীরা সমাবেশে অংশ নেন। বিদেশিদের সমালোচনা দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা তৎপরতা আছে। বর্তমানে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে মার্কিন একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। দুই সপ্তাহের সফরে এসেছ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদল। এর আগে নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে, যা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীনদের। এ নিয়ে ক্ষোভও আছে দলটির নেতাদের, যা এ সমাবেশে কয়েকজন নেতার বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। ওবায়দুল কাদের তাঁর বক্তৃতায় বলেন, কোনো বাধা দেব না। কাউকে আক্রমণ করতে যাব না। ঢাকায় বিদেশি বন্ধুরা এসেছেন, তাঁরা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন। আমাদেরও লক্ষ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যারা বাধা দিতে আসবে, আমরা তাদের প্রতিহত করব। বিএনপি বিদেশিদের হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমতায় বসার জন্য ভিক্ষা চাইছে- এমন অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বিদেশিদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা আমাদের উন্নয়নের সহযোগী। আপনাদের আমরা সম্মান করি। কিন্তু বাংলাদেশ ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত। রক্তে লেখা সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। বিদেশিরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ করেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কারও করদ রাজ্য নয়। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চলবে না। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ওই ঘটকেরা এখনো বাংলাদেশে আছে। একাত্তর সালে আমরা বহু বড় বড় দেশকে মোকাবিলা করেছিলাম। সেই সময় আমাদের অনেক বন্ধু ছিল। সেই বন্ধুরা এখনো আমাদের সঙ্গে আছেন। আমাদের জয় অনিবার্য।’ তিনি বলেন, শেখ হাসিনার অধীনেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। যারা আজকে ওকালতি করছে, তখন তারাও শেখ হাসিনার পক্ষ নেবে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী। সমাবেশ পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান। অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর কবির নানক; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও মাহবুব উল আলম হানিফ; সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, মির্জা আজম, এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, উত্তরের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির প্রমুখ। এ ছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

বিএনপির ৩১ দফা : পরপর দুই টার্মের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়

সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ৩১ দফা যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করেছে বিএনপি। ১৩ জুলাই রাজধানীর গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের জনগণের হাতে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এই ৩১ দফা যৌথ রূপরেখা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ চেয়ে ‘এক দফা, এক দাবি’ ঘোষণার এক দিন পর বিএনপি এই রূপরেখা তুলে ধরল। ৩১ দফা রূপরেখাকে দলীয় ‘প্রতিশ্রুতি’ উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই রূপরেখা বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী প্রস্তাব। এক দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে হীন উদ্দেশ্যে মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষেত্রে অনেক অযৌক্তিক সংশোধনী এনেছে। একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করে এসব বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তন পর্যালোচনা করে রহিত বা সংশোধন করা হবে। অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সাংবিধানিক সংস্কারও করা হবে। সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বেগম সেলিমা রহমান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সেই রাষ্ট্রের মালিকানা আজ তাদের হাতে নেই। বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। তিনি বলেন, এ রাষ্ট্রকে মেরামত ও পুনর্গঠন করতে হবে। জনগণের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়লাভের পর বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার হটানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া ঘোষিত রূপরেখায় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে, পর পর দুই টার্মের অতিরিক্ত কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ইভিএম নয়, সব কেন্দ্রে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট প্রদান নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপির রাজনীতি দফার বিভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছে : আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির রাজনীতি দফার বিভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো ১০ দফা, কখনো ২৭ দফা, কখনো এক দফা, আবার কখনো ৩১ দফা। বিএনপির বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত এসব দফা জনগণ এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তারা কিছুদিন পরপর নতুন নতুন দফা নিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।’ ১৩ জুলাই আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উত্থাপিত রূপরেখাকে অন্তঃসারশূন্য ও অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির এই দফা জনগণের চাহিদা বিবেচনা করে নয়, বরং ঐতিহ্যগতভাবে তাদের দুর্নীতি, লুটপাটতন্ত্র এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার স্বৈরতান্ত্রিক অপরাজনীতি ফিরিয়ে আনার কূটকৌশল। তাদের এসব দফা ও রূপরেখায় জনকল্যাণের সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপন্থা নেই। জনগণ তাদের আস্থায় না নিলেও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা মরিয়া হয়ে অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আজ যেসব রূপরেখা ও দফা তুলে ধরছে, প্রকৃতপক্ষে তারা তা বিশ্বাস ও ধারণ করে না। কারণ তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এসব নীতির বিরুদ্ধে সব ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে ছিল। ‘গণতন্ত্র’-কে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে তারা দুর্নীতির বরপুত্র, একুশে আগস্টের নারকীয় গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তারেক রহমানের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএনপি জনগণকে সেই ‘হাওয়া ভবন’-এর দুঃশাসনের যুগে ফিরিয়ে নিতে চায়। আজ তারা দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা বলছে। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক, জনতার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেছে। কৃষি খাতে ব্যাপক প্রণোদনা ও কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ক্ষুধা ও চরম দারিদ্র্যের অভিঘাত থেকে মুক্তি পেয়েছে জাতি। বিএনপির এই ধরনের তথাকথিত রূপরেখা ও আন্দোলনের হুমকি বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তির ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।’

এক দফা বনাম এক দফা : জনগণের দফা কী?

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানপোড়েনের মধ্যে যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ঢাকায় এলেন, তার পরদিনই রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ করে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে নয়াপল্টনে হয় বিএনপির সমাবেশ। এর অদূরেই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটের সামনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ। বিএনপি চায় সরকারের পদত্যাগ। এটি এখন তাদের একমাত্র দাবি। মানে এক দফা। আওয়ামী লীগেরও এক দফা। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারো অধীনে নির্বাচন হবে না। অর্থাৎ দেশের প্রধান দুই দলই এখন এক দফায় এসে স্থির হয়েছে। কেউ কেউ রসিকতা করে একে বলছেন ‘দফারফা’। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই এক দফার ভবিষ্যৎ কী? যদি প্রধান দু’টি দল তাদের এক দফায় অনড় থাকে, তাহলে তাতে দেশের ‘দফারফা’ হবে কী-না? উপরন্তু যারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি করেন না; যারা সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন; সেই আমজনতার দফা কী? তারা কী চান? প্রধান দুই দলের নেতারা কী জনগণের প্রত্যাশা বা জনগণের কী দফা সেটি কখনো জানার চেষ্টা করেছেন?

কয়েকটি প্রশ্ন
যদি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, তাতে কি বিএনপি অংশ নেবে? বিএনপি কি নির্বাচন বর্জন বা বয়কট করে সেটি প্রতিহত করতে চাইবে? নির্বাচন প্রতিহত করার মতো সাংগঠনিক শক্তি এবং জনমত কি বিএনপির সঙ্গে আছে? যদি বিএনপি নির্বাচন বয়কট বা বর্জন করে, তাহলে ওই নির্বাচন কি দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে? যদি গ্রহণযোগ্যতা নাও পায়, তাতেও কি আওয়ামী লীগের পুনরায় সরকার গঠনে কোনো অসুবিধা হবে? যদি বিএনপি ও তার সমমান দল এবং বিদেশি চাপ উপেক্ষা করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ তথা সরকার অনড় থাকে, তাহলে দেশে কি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে? যদি হয় তাহলে সেই সংকটের পরিণতি কী হবে? কেননা কোনো দল যদি ছাড় না দিয়ে নিজের জায়গায় স্থির থাকে, তাহলে আদৌ সংঘাত এড়ানো যাবে কী? আর যদি সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয় সেটি প্রধান দুই দল ও জোট তো বটেই, সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য আদৌ কি কল্যাণ বয়ে আনবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য এবং বিরোধের ফলে অরাজনৈতিক কোনো গোষ্ঠী সামনে চলে আসে এবং কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা আর রাজনীতিবিদদের হাতে থাকে না। এরকম পরিস্থিতি যে দেশের জন্য মঙ্গলজনক কিছু বয়ে আনে না, সেটি বারবার প্রমাণিত। সুতরাং প্রধান দুই দল নিজেদের এক দফা দাবিতে অনড় থাকলে তাতে যে দেশের দফারফা হবে- তাতে সন্দেহ কম।

জনগণের দফা কী?
প্রশ্ন হলো, দেশের প্রধান দুই দলের এখন এক দফা কী হওয়া উচিত? এক দফা হওয়া উচিত এরকম: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দুর্নীতিতে লাগাম দিয়ে নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। যেখানে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন মুখ্য নয় বরং কম খেয়ে পরে হলেও যে ব্যবস্থাটি কল্যাণকর, মানবিক, সহনশীল এবং যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ নির্ভয়ে ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু এই এক দফা বাস্তবায়নে কি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনোদিন একমত হবে? সরকারের মন্ত্রীরা, সরকারি দলের নেতারা বলেন, তাঁরা সুষ্ঠু নির্বাচন চান। বিরোধী দলও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। তাহলে সমস্যা কোথায়? নির্বাচন হলো ‘জনগণের ইচ্ছার’ চূড়ান্ত প্রকাশ। সেটি তখনই সম্ভব, যখন সব দল ও জনগোষ্ঠী সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। কোনো দল বা পক্ষকে বাইরে রেখে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। এখানেও জনগণের কোনো ভূমিকা নেই, কোনো মতামত নেই। যারা জনগণের কথা বলে রাজনীতি করছেন, তারা কি একবারও জনগণের কাছে জানতে চেয়েছেন, জনগণের দফা কী? তাদের চাওয়া কী? জনগণ চায় স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি, বাজারে পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং ভোট দেওয়ার অধিকার। সেই ব্যাপারে সরকারি বা বিরোধী দলের কোনো ভাবনা আছে কী? বাজার দর আকাশ ছুঁয়েছে, তা নিয়ে সরকারি দলেরও কোনো মাথাব্যথা নেই, বিরোধী দলেরও কোনো কর্মসূচি নেই। পরিশেষে, রাজনীতির মাঠ ও মঞ্চে প্রধান দুই দল যে কথাই বলুক এবং নিজেদের এক দফায় যতই অনড় আছে বলে মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে কি কোনো আপসরফা হতে পারে? সেক্ষেত্রে দুই দলেরই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। কেননা দিন শেষে ব্যক্তির চেয়ে দল এবং দলের চেয়ে যে দেশ ও জনগণ বড়- সেই উপলব্ধিটা জরুরি। রাজনীতিবিদদের কাছে যদি দেশ ও জনগণের চেয়ে দল কিংবা ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠে, তাহলে তার খেসারত দিতে হয় দেশ এবং দেশের সাধারণ মানুষকে। বাংলাদেশকে এরকম খেসারত আর দিতে না হয়, সেটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

সর্বশেষ - ধর্মতত্ত্ব