সারা বিশ্বের যে কোনো দেশের অর্থনীতির গতি ফেরাতে স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসন অপরিহার্য। অস্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসনের অভাবে কোনো দেশের অর্থনীতিই সুষ্ঠুভাবে এগোতে পারে না। তাই সমদ্ধ অর্থনীতির দেশ গড়তে স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। এরই আলোকে অস্থির রাজনীতির রোষানলে সুশাসনের অভাবে দেশের অর্থনীতি গতিহারা। স্বাধীনতা উত্তর এখনো এই দেশের রাজনীতি অস্থির এবং নেই সুশাসন। অস্থির রাজনীতি ও সুশাসনের অভাবেই এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করেন দেশের অভিজ্ঞমহল। তাই দেশে সুস্থধারার রাজনীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা-না হলে মেধাশূন্য হয়ে গড়ে উঠবে আগামীর প্রজন্ম। ফলে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট এই ভূখণ্ড মুখ থুবরে পড়তে পারে। বলতে গেলে, দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের সংগে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিষয়টি মানবদেহের কান ও মাথার মতো সংযুক্ত। একটিতে টান লাগলে অন্যটি এমনিতেই নূয়ে পড়ে। তাই দেশের অর্থনীতির গতি ফেরাতে স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে দরকার। অথচ দেশের অস্থির রাজনীতি ও সুশাসনের অভাবে গতিহীন অর্থনীতি। তাই অর্থনীতির গতি ফেরাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এই নিয়েই এবারের টাইমওয়াচ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন; লিখেছেন এ কে নাহিদ
স্বাধীনতা উত্তর নানা আলোচনা ও সমালোচনার জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা; এই সরকারের কাছে দেশের সর্বস্তরের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা। তবে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি কর্মবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া লাখো তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সর্বোপরি স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও দেশে সুশাসন নিশ্চিত হয়নি। বর্তমান সরকার অর্থনীতির গতি ফেরাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বড় জাতীয় বাজেট পাশ করেছে। অথচ এই বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে; এর জন্য কোনো ধরণের রোডম্যাপ এবং মনিটরিং সেল গঠন করা হয়নি। এই সরকারের বাজেট টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), ফ্রিল্যান্সার, নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে সহজেই অনুমেয় যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি শুধু শিল্পায়নের ওপর নয় বরং উদ্ভাবন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং উদ্যোক্তা বিকাশের ওপরও নির্ভরশীল। তবে শুধু রাজস্ব বা আর্থিক নীতির ওপর নির্ভর করে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে দেশের বিশিষ্টজন মনে করেন। তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সঠিক নীতিমালা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তথা সুশাসন নিশ্চিত করা। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ওপর নির্ভর করে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত না হওয়ার নিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসন শেষে নতুন সরকার একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। ওই সময়ে সুশাসনের অভাবে ব্যাপক মব সহিংসতা, লাগামহীন চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শ্রমিক অসন্তোষ, তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও ক্ষুণ্ন করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাজপথে আন্দোলনের আহ্বান নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। দেশের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংঘাত নয় বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। অথচ রাজনৈতিক কুতর্ক-কুবিতর্ক, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকারের বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। দেশের বিশিষ্টজনের মতে, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশলের অংশ হতে পারে। তারা ক্ষণিকের উত্তেজনা ফুটবল সমর্থকদের বিরোধকে ঘিরে আইএসআইএস বা আল-কায়েদার পতাকার আদলে তৈরি ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শনের ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য সমাজে বিভাজন গভীর করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো। বলতে গেলে, দেশে কোনো ধরণের সুশাসন নেই। কিছু বিশ্লেষকের অভিযোগ, উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত কিছু ব্যক্তিকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত করেছে, যাতে দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল থাকে। এতে দেশের রাজনীতিবিদদের দায় এড়ানোও অতি সহজ। এসব অভিযোগ সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন এবং সেগুলোর সত্যতা অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে দরকার।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখে না। দেশের বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তা চান। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ব্যক্তি খাতনির্ভর। ব্যক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সে জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং উৎপাদনমুখী খাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে এমন একটা পরিবেশ যেখানে সাধারণ মানুষের স্বস্তি থাকবে, পাশাপাশি শিল্প থেকে শুরু করে দেশের স্বাভাবিক যে কাজকর্ম তা অব্যাহত থাকবে।‘এমন একটা পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আস্থা থাকে। বিশেষ করে ছাত্র থেকে শুরু করে পুরো তরুণ প্রজন্ম যেন দেশের ওপর একটা বিশ্বাস রাখে। কথায় কথায় তারা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কথা ভাবেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য অবশ্যই তারা যেতে পারেন, কিন্তু তারা যেন দেশে ফিরে আসেন সেটা আমরা চাই। তারা যেন মনে করতে পারেন যে দেশে অপার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে তরুণদের প্রয়োজন সংঘাত নয়, কর্মসংস্থান। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা- ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হলে তাতে বিনিয়োগ বাড়বে।
নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত হলে দেশে শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণ হবে। একইভাবে শ্রমিকরাও শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে লাভবান হন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে নয়। স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতিটি রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর মূল্য পরিশোধ করতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকেই। দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণের বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব উদ্যোগ সফল হলে অনেক শ্রমিক স্বল্প-দক্ষ শ্রম থেকে অধিক উৎপাদনশীল ও দক্ষ পেশায় স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন। এর ফলে যেমন পারিবারিক আয় বাড়বে তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে।
সারা বিশ্বে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিরোধী দলগুলোর শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি নীতির সমালোচনা এবং জনমত গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনোই জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের বিনিময়ে না হয়। দেশের যেসব কর্মকাণ্ড ব্যবসায়িক আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেগুলো রাজনৈতিক আনুগত্য নির্বিশেষে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশকে এখন সংঘাতের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগের সুফল বাস্তবায়ন কেবল সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করবে না বরং দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্বশীল আচরণ, আইন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতার ওপরও নির্ভর করবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে কিন্তু তা যেন অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি না করে। কারণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। সর্বোপরি টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আইনের শাসন এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ- এই চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে দেশের অর্থনীতির গতি ফেরাতে স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাশন সর্বাগ্রে দরকার। স্থিতিশীল রাজনীতি ও সুশাসনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হোক; এটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

















